কুমিল্লা প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সমেশপুর। গ্রামের মাঠের পাশে ময়নামতি রেশম বোর্ডের অফিস। ৬০ এর দশকে রেশম বোর্ডে শ্রমিকরা দৈনিক বেতন পেতেন ৩-৫টাকা। গ্রামের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ দৈনিক শ্রমিক হিসেবে ও চুক্তিতে রেশম কীট পালনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এতে তাদের পরিবারে টানাটানি লেগেই থাকতো। সেই শ্রমিকদের পরিবারে সুদিন ফিরেছে। তারা মৌসুমে এখন গোনেন কয়েক লাখ টাকা। সমেশপুর গ্রাম থেকে গত মৌসুমে ১৫ কোটি টাকার বেশি সবজি চারা বিক্রি হয়েছে।

স্থানীয় ও কৃষি অফিসের সূত্র জানায়, সমেশপুর গ্রামে ৭০ বছর আগে ইউসুফ আলী নামের এক ব্যক্তি সবজির চারা উৎপাদন শুরু করেন। তার দেখাদেখি রেশম বোর্ডের শ্রমিকসহ অন্যান্যরা চারা উৎপাদনে আসেন। এখন গ্রামের শতাধিক পরিবার ২০ একর জমিতে চারা উৎপাদন করছেন। সেই চারা যাচ্ছে সারা দেশে। এই মৌসুমে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ২০কোটি টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তা আরো বাড়তে পারে।

সরেজমিন সমেশপুরে গিয়ে দেখা যায়, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক। মহাসড়ক লাগোয়া কুমিল্লা বড়িচং উপজেলায় ময়নামতি সাহেবের বাজার। বাজারের ডান পাশে ময়নামতি রাণীর বাংলো নামের প্র্ত্ন পর্যটন এলাকা। তার পাশ দিয়ে হাঁটা পথে উত্তরে গেলেই সমেশপুর সবজি চারার মাঠ।  সকাল থেকেই মাঠ জুড়ে চারা উৎপাদনের উৎসব। কেউ কোদাল হাতে জমি প্রস্তুত করছেন। কেউ চারায় পানি দিচ্ছেন। কেউ চারা তুলছেন,কেউবা চারা বিক্রির দরদাম করছেন। মাঠে চোখে পড়ে বাঁধাকপি,ফুলকপি, লাউ,মরিচ ও ক্যাপসিক্যামসহ বিভিন্ন সবজির চারা।

কৃষক ক্রেতার গাড়িতে চারা তুলে দিচ্ছেন। সবুজ চারা বিক্রি করে নিচ্ছেন নগদ টাকা। মাঠে নগদ টাকা পেয়ে তাদের শরীরের ক্লান্তি কেটে যায়, ঘর্মাক্ত মুখে চিক চিক করে উঠে খুশির আমেজ। সেখানে মাঠ তদারকি করতে দেখা যায়, উপজেলা কৃষি অফিসার আফরিণা আক্তার, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার আতিকুর রহমান ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইভা আক্তারকে। তারা কৃষকদের চারা উৎপাদনের সঠিক প্রক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছেন।
৪০ বছর ধরে চারা উৎপাদন করেন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, আমরা রেশম বোর্ডের কীট পালন করতাম। এখানে প্রথম দিকে কেউ কেউ দৈনিক ৩টাকা কেউ ৫ টাকা মজুরি পেতেন। আমি অবশ্য আরো বেশি পেতাম। গ্রামে ইউসুফ আলী নামের একজন প্রথম চারা উৎপাদন করেন। তার দেখাদেখি আমরা শুরু করি। চারা উৎপাদন করে আমাদের গ্রামের অধিকাংশ পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছেন।
চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ২০বছর চারার ব্যবসা করেন। তাদের চারার মান ভালো হওয়ায় এখানে কুমিল্লা,চট্টগ্রাম,ব্রাহ্মণবাড়িয়া,চাঁদপুর,মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার ক্রেতারা আসেন। সার বীজের দাম কমলে আমাদের আরো লাভ ভালো হবে।

চট্টগ্রাম মীরেরশরাই উপজেলার গোপালনগর গ্রামের শাহ আলম এসেছেন চারা কিনতে। তিনি বলেন,এখানের চারার মান ভালো হওয়ায় এত দূর থেকে এখানে এসেছি। আজ থেকে এখান থেকে বাঁধাকপি ফুলকপির চারা কিনেছি। এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো চারা পাওয়া যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থেকে এসেছেন নুর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, সবজির চারার জন্য সমেশপুর আশপাশের গ্রাম প্রসিদ্ধ। আমরা চারজন একসাথে এখানে চারা কিনতে এসেছি। এখান থেকে ৩০ বছর ধরে চারা ক্রয় করছি। এবার ২৪ শতাংশ জমিতে চারা লাগাবো।

উপজেলা কৃষি অফিসার আফরিণা আক্তার বলেন, এই এলাকা ৩০বছর আগে এত সমৃদ্ধ ছিলো না। চারা উৎপাদন এখানে এখন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মৌসুমে তারা ১৫ কোটি টাকার চারা বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছেন, এবার তাদের লক্ষ্যমাত্রা ২০ কোটি টাকা। রেশম বোর্ডের অল্প আয়ের সেই শ্রমিকরা এখন লাখপতি। আমরা তাদের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকি। এখানে জলাদ্ধতার কারণে কিছু উৎপাদন কমেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা কাজ করছি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version