ডেস্ক নিউজঃ কঠোর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের নতুন চালান পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে ইউরেনিয়াম বহনকারী বিশেষ গাড়িবহরটি সফলভাবে প্রকল্প অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

এর আগে শুক্রবার রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে রাশিয়া থেকে তেজস্ক্রিয় জ্বালানিবাহী বিশেষ কার্গো বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরবর্তীতে শনিবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে সেনাবাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সড়কপথে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে বহরটি। যাত্রাপথে বঙ্গবন্ধু সেতু অতিক্রম করে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার দাশুড়িয়া হয়ে এটি রূপপুরে পৌঁছায়। প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইউরেনিয়ামের এই চালানটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আকাশপথে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে নির্ধারিত বিরতি দিয়ে চালানটি বাংলাদেশে আনা হয়। প্রাথমিকভাবে বৃহস্পতিবার আসার কথা থাকলেও সময়সূচি পরিবর্তন করে শুক্রবার দুপুরে এবং পরবর্তীতে তা পুনর্নির্ধারণ করে শুক্রবার গভীর রাতে ঢাকায় অবতরণ করানো হয়। সড়কপথে পরিবহনের সময় নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে এবং যানজটমুক্ত পথ নিশ্চিত করতে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে সতর্কতামূলকভাবে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।

নিরাপত্তার বিষয়ে পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) প্রণব কুমার জানান, ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পাবনা জেলা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সার্বক্ষণিক কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলে। কোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে না ঘটে, সেজন্য বেলা পৌনে ১২টা থেকে সোয়া ১২টা পর্যন্ত পাবনা-নাটোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। গাড়িবহরটি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের পরপরই মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৯টি কার্গো ফ্লাইটে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি বাংলাদেশে আসবে। এর মধ্যে সাতটি কার্গো দ্বিতীয় ইউনিটের মূল জ্বালানির জন্য এবং দুটি কার্গো প্রথম ইউনিটের পরবর্তী রিফুয়েলিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন (রসাটম) জানিয়েছে, নির্ধারিত সূচি মেনে ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো জ্বালানি সরবরাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই মেগা প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হলেও কমিশনিংয়ের কিছু জটিলতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। বিশেষ করে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি) সংক্রান্ত কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যক্রম থমকে ছিল। তবে সম্প্রতি ১৬ মেগাপ্যাসকেল উচ্চচাপে সেফটি ভালভের সফল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে জানিয়েছে এনপিসিবিএল কর্তৃপক্ষ। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও কিছু বাধ্যতামূলক ও স্পর্শকাতর পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তির আওতায় দেশের সবচেয়ে বড় এই কম-কার্বন বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ইউরেনিয়ামের নতুন চালান পৌঁছানো এবং ভালভ সমস্যার সফল সমাধান বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কমিশনিং কার্যক্রমে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version