আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তেলবাহী জাহাজের চলাচল ও পণ্য পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। এর পাশাপাশি পাইপলাইন ও হরমুজ এড়িয়ে যাওয়া বিভিন্ন বন্দর দিয়ে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রতিদিন আরও প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ যুদ্ধ শুরুর পরের সর্বনিম্ন অবস্থার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহের এই পুনরুদ্ধার বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

কেপলারের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতো। বর্তমানে তা প্রায় ১ কোটি ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন বিকল্প রুটসহ মধ্যপ্রাচ্যের মোট তেল রপ্তানিও আগের তুলনায় বেড়েছে।

তবে জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন উৎসের তথ্য আলাদা হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের প্রবাহ বেড়েছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল স্টার্নঅফ বলেন, কোনো একটি ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে একাধিক উৎসের পরিসংখ্যান বিবেচনা করা উচিত। তবে সব তথ্যই সেপ্টেম্বরে তেলের প্রবাহ বাড়ার দিকে ইঙ্গিত করছে।

হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বাড়ার পেছনে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। জাহাজগুলোকে হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে মার্কিন বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। এতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো আবারও হরমুজের মাধ্যমে তেল পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ইউজিন ঘোলেজ বলেন, শিপিং কোম্পানিগুলোর আস্থা ধীরে ধীরে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণও বাড়ছে।

তবে তেল সরবরাহ বাড়লেও বিশ্ববাজারে এর দাম এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও চাপ তৈরি করছে।

পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় জ্বালানি সরবরাহ এখনো কম। ফলে বাজার এখনো বেশ আঁটসাঁট অবস্থায় রয়েছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ইরান চাইলে আবারও তেলবাহী জাহাজ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বাড়াতে পারে। এমনটি হলে তেলের সরবরাহ আবারও কমে গিয়ে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও হামলার পর বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারকদের বিকল্প পথের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বিষয়ক ফেলো জিম ক্রেন বলেন, সংঘাত আরও বাড়লে ইরানের হাতে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর একাধিক সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে দেশটি কিছুটা সংযত অবস্থানে রয়েছে বলে তাঁর ধারণা।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি নিরাপদ ও স্বাভাবিক হয়ে গেছে—এমনটা এখনো বলা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থাগুলোর অনেকেই নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে এ পথ এড়িয়ে চলছে। মার্কিন সামরিক নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও প্রণালির আশপাশে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের মহাসচিব আর্সেনিও ডমিঙ্গেজও বলেছেন, হরমুজ প্রণালিকে এখনো নৌ চলাচলের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত বলা যায় না, কারণ জলপথটি নিরাপদ হয়নি।

কেপলারের কমোডিটি রিসার্চ বিভাগের পরিচালক ম্যাট স্মিথ বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব মাত্রার প্রায় ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে উৎপাদন ও শোধনাগারের কার্যক্রম আরও বাড়ানো এবং হরমুজ পারাপারের নিরাপত্তাঝুঁকি কমানো ছাড়া স্বাভাবিক পরিস্থিতি পুরোপুরি ফিরবে না।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version